ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে সংঘর্ষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়েছেন। পাল্টা জবাবে ইরান একাধিক দেশে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ফলে অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা, জ্বালানি ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো, সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালায়। প্রথম দফাতেই খামেনির কার্যালয় ধ্বংস হয় এবং তিনি নিহত হন। ইসরায়েলি বাহিনীর দাবি, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)–এর একাধিক শীর্ষ কমান্ডার নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী শামখানি, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আজিজ নাসিরজাদেহ এবং আইআরজিসি কমান্ডার জেনারেল মুহম্মদ পাকপৌরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পরে আহমেদ ভাহিদিকে নতুন কমান্ডার ঘোষণা করা হয়।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে। দক্ষিণাঞ্চলে একটি আইআরজিসি ঘাঁটির কাছে স্কুলে হামলায় শিশুসহ বহু হতাহতের অভিযোগও উঠেছে। দেশটিতে ইন্টারনেট সংযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন এবং আকাশসীমা বন্ধ রাখা হয়েছে। ইরান কীভাবে জবাব দিয়েছে?
ইরান ইসরায়েল ছাড়াও বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডন, সৌদি আরব ও সাইপ্রাসে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
ওমান উপসাগরে ১১টি ইরানি জাহাজ ধ্বংসের দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্ট-কম)। অপরদিকে ইরান দাবি করেছে, তারা তেল আবিবসহ বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করেছে। জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতে হামলা চালিয়েছে। এতে নতুন একটি ফ্রন্ট খুলেছে। কেন হামলা চালালো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল?
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য ছিল—ইরান যেন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর আগে থেকেই ইরানকে নতুন পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি না হলে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছিল ওয়াশিংটন।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানের “অস্তিত্বগত হুমকি” নির্মূল করতেই এই অভিযান। ইরান অবশ্য হামলাকে “বিনা প্ররোচনায় ও অবৈধ” বলে বর্ণনা করেছে।
জ্বালানি বাজারে প্রভাব: হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ চলাচল করে। ইরান আগেই সতর্ক করেছিল, প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কাতার গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখায় আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। সৌদি আরবের রাস তানুরা শোধনাগারে ড্রোন হামলার পর আংশিক কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছে। খামেনির উত্তরসূরি কে?
ইরান জানিয়েছে, দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হবে। অস্থায়ীভাবে একটি নেতৃত্ব কাউন্সিল দায়িত্ব নিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন নেতা নির্বাচন করবে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’—৮৮ সদস্যের ধর্মীয় পরিষদ। তবে চলমান নিরাপত্তা সংকটের কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়া জটিল হতে পারে।
যুদ্ধ কতদিন চলতে পারে?
ট্রাম্প বলেছেন, “যতদিন প্রয়োজন” অভিযান চলবে। নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ একই গতিতে অভিযান চালানো সম্ভব। নেতানিয়াহুও বলেছেন, প্রয়োজন হলে দীর্ঘ সময় ধরে অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আরও দেশ এতে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং আঞ্চলিক সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
ভ্রমণ ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ আকাশসীমা বন্ধ করেছে। হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল বা রুট পরিবর্তন করা হয়েছে। দুবাইভিত্তিক এমিরেটস সীমিত আকারে ফ্লাইট চালু রাখলেও কাতারের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় দোহায় উড়োজাহাজ ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ফরেন অফিস ভ্রমণকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে।
Leave a Reply