নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি — গোলাম রব্বানী (আর আর স্টার টিভি):*
সাধারণ মানুষের শেষ আস্থার জায়গা দেশের বিচার বিভাগ। কিন্তু আদালতের বেশিরভাগ মামলায় এখন নিয়মিত দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও অযথা সময়ক্ষেপণ। সাধারণ বিচারপ্রার্থীদের মাঝে একটি অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়—কেবলমাত্র নিজের ব্যক্তিগত আয় ও ফি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে একশ্রেণীর আইনজীবী অল্প সময়ে শেষ হতে যাওয়া মামলাকেও বছরের পর বছর ঘুরিয়ে দীর্ঘায়িত করেন। বিচার প্রক্রিয়ার এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগে সমাজে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা।
### ১. আয় বাড়াতে মামলা ঝুলিয়ে রাখার কৌশল
জনমনে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে আইনজীবীদের মামলা ঝুলিয়ে রাখার প্রবণতা। যে মামলাটি সঠিক উদ্যোগ নিলে খুব দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যেতে পারে, সেটিকেই বারবার অপ্রয়োজনীয় সময় আবেদন (Time Petition) কিংবা আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে দুই, তিন কিংবা পাঁচ বছর ধরে ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। প্রতি তারিখে বিচারপ্রার্থীর কাছ থেকে ফি নেওয়া নিশ্চিত করতেই কিছু অসাধু আইনজীবী মামলা দ্রুত শেষ করার বদলে তা টেনে লম্বা করেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
### ২. আইনজীবীদের উপস্থাপন ও কৌশল
আদালতে জজের সামনে বিচার্য বিষয়টিকে ঠিক কীভাবে পেশ করা হচ্ছে, তা অনেকাংশে আইনজীবীর দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় উকালতি কৌশলের কারণে সত্য ঘটনাটি আড়ালে গিয়ে অন্য রূপ ধারণ করে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে মামলার ভবিষ্যৎ ও সময়সীমার ওপর।
### ৩. জজের হাত যেখানে বাঁধা (বিচারকের সীমাবদ্ধতা)
সাধারণ মানুষ মনে করেন বিচারক চাইলেই সব সমাধান করে দিতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে তা নয়। একজন জজ সম্পূর্ণভাবে আদালতে জমা হওয়া বস্তুনিষ্ঠ তথ্য-প্রমাণ, কাগজপত্র ও আইনি যুক্তির দ্বারা আবদ্ধ থাকেন। আদালতে লিখিত ও পেশ করা সাক্ষ্য-প্রমাণের বাইরে গিয়ে জজ নিজের ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর নির্ভর করে রায় দিতে পারেন না। এই অর্থে, নির্ধারিত প্রমাণের বাইরে গিয়ে একা বিচারকের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়; তাঁর হাত অনেকটা বাঁধা থাকে।
### ৪. মিথ্যা মামলার বিস্তার ও চরম ভোগান্তি
মামলা দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার কারণে সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা। ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটাতে বা প্রতিপক্ষকে সামাজিকভাবে নিঃস্ব করতে মিথ্যা মামলাকে এই দীর্ঘসূত্রতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে একশ্রেণীর অসাধু চক্র।
### উত্তরণের উপায়: সৎ ও মানবিক আইনজীবীর প্রয়োজনীয়তা
আইনচর্চা কেবল অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়, এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র ও সামাজিক দায়িত্বশীল পেশা। এই পবিত্র পেশাকে মানুষের চোখে শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলতে এবং দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে প্রয়োজন সৎ ও মানবিক আইনজীবী।
* *ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠা:* কেবল আয়ের উদ্দেশ্যে মামলা দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মানসিকতা তৈরি করা।
* *সঠিক জেরা ও গবেষণা:* আইনি নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণ সঠিকভাবে উপস্থাপন করে বিচারককে সঠিক রায়ে পৌঁছাতে সাহায্য করা।
* *মিথ্যা মামলা বর্জন:* ভিত্তিহীন ও অসত্য মামলা পরিচালনা থেকে নিজেদের বিরত রেখে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি থেকে রক্ষা করা।
বিচারের নামে সাধারণ মানুষের এই দীর্ঘ ভোগান্তি অবসান ঘটাতে বিচার বিভাগের কঠোর তদারকি এবং আইনজীবীদের পেশাগত নৈতিকতা ফিরিয়ে আনার দাবি সচেতন নাগরিক সমাজের।
Leave a Reply