রাজধানীর বাংলামোটরে যাত্রী ছাউনির নিচে খালি গায়ে বসে আছেন মোক্তার হোসেন। বারবার তোয়ালে দিয়ে গাম মুছতে দেখা যায় তাকে। মোক্তার জানান, কাতার যাবেন তাই মেডিকেল করাতে ঢাকায় এসেছেন। গত সপ্তাহে সিরিয়াল দিলেও এখন স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়নি। তাই প্রতিদিন সকালে এসে বসে থাকেন এখানে। হোটেলে গিয়ে যে একটু শান্তিতে বিশ্রাম নেবেন, তারও উপায় নেই লোডশেডিংয়ের কারণে।
মোক্তারদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন পাশে বসে থাকা রিকশাচালক আমির হোসেন বলেন, গরমের কথা আর কইয়েন না। সকাল থেকে তিন ট্রিপ মারতে জীবন বাইর হইয়া গ্যাছে। মনে হয় শইল্লের (শরীরের) সব পানি বাইর হইয়া গেছে। দুই-তিন বোতল পানি খাইছি। তারপরেও শরীর দুর্বল লাগে। মাথাডাও ঘুরতাছে। আজকে আর রিকশা চালাইতে পারব না। তিনি জানান, সাধারণত দিনে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করেন রিকশা চালিয়ে। কিন্তু সোমবার তার আয় হয়েছে ৩২০ টাকা।
চলতি বছরের মে মাসের শুরুটাই হয়েছিল প্রচণ্ড গরমের মধ্য দিয়ে। এরপর ঘূর্ণিঝড় মোখার প্রভাবে কক্সবাজার ও এর আশপাশের এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত হয়। তবে সারা দেশে বৃষ্টিপাত হয় এর দুদিন পর থেকে। কয়েক দিন বৃষ্টির পর আবার শুরু হয় প্রচণ্ড গরম; যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ফলে শুষ্ক প্রকৃতিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জীবন। সূর্যের বিচ্ছুরণে মধ্যবেলায় প্রকৃতি নেয় অগ্নিরূপ। এর মধ্যে আকাশে নেই মেঘের দেখা। বাতাসের গতিও কম। যেটুকু বাতাস রয়েছে তাতেও যেন আগুনের হল্কা। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া মানুষ বাইরে বের হচ্ছে কম।
এদিকে দেশ জুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে গত রবিবার দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় চার দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের সব খেলাও স্থগিত করা হয়েছে।
গত কয়েক দিন ধরে দেশের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা স্বাভাবিকের চেয়ে স্থানভেদে ৪ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। গতকালও দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় দিনাজপুরে, ৪০ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রাজধানীসহ দেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ। সপ্তাহ জুড়েই এ তাপপ্রবাহ থাকতে পারে। দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর প্রভাব বাংলাদেশের দিকে কম থাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ অনুভূত হচ্ছে। তবে মৌসুমি বায়ু এ মাসের মাঝামাঝি সময় প্রবাহিত হবে।
এর আগে আবহাওয়া অফিস জানায়, এপ্রিল মাসে ৮৬ শতাংশ বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। মে মাসে কম হয়েছে ৪৬ শতাংশ। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আগে মার্চ-এপ্রিল-মে পর্যন্ত তাপপ্রবাহ হলেও, এখন তা অক্টোবর পর্যন্ত হচ্ছে। এক যুগ ধরেই এ পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেচ্ছা বলেন, ‘আমরা আশা করছি আগামী সপ্তাহে দেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত শুরু হতে পারে। ১২ জুন কিছু এলাকায় বৃষ্টি হলেও সারা দেশ থেকে যে তাপপ্রবাহ চলে যাবে বিষয়টা এমন নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের যে মৌসুমি বায়ু সেটা আসতে একটু দেরি হচ্ছে ফলে বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। একদিকে বাতাসের গতিবেগ কম, অন্যদিকে বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য বেশি। ফলে মানুষ বেশি অস্বস্তি অনুভব করছে।’
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. মোহন কুমার দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষ করে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, নেপালের একটি অংশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া এ পুরো অংশটি এক-একটি হিট ইঞ্জিন। এসব দেশের তাপমাত্রা কোথাও কোথাও ৪১-৪৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘একদিকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি অন্যদিকে ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষিতে তাপপ্রবাহ বাড়ছে। কিন্তু এই তাপ শুষে নেওয়ার যে উপাদান জলাশয়, মাটি বা গাছপালা তা কিন্তু কমছে। ফলে যেটুকু তাপ উৎপন্ন হচ্ছে, মানুষ তার বেশি অনুভব করছে। শহরের এ উপাদানগুলো যদি পর্যাপ্ত থাকত তাহলে হয়তো গরম অনুভব হতো কিন্তু ক্লান্তি লাগত না। ঐতিহাসিকভাবে তাপমাত্রা ছিল, এখনো আছে। কিন্তু দমবন্ধ একটা পরিবেশ তৈরি করছি। ফলে জীবনব্যবস্থায়ও এক ধরনের প্রভাব তৈরি করছে।’
আবহাওয়ার এমন চরম ভাবাপন্ন হওয়ার জন্য তিন ধরনের কারণ রয়েছে বলে মনে করেন আবহাওয়া বিশ্লেষকরা। বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১.৪ ডিগ্রি বেড়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় ও আঞ্চলিক প্রভাবও রয়েছে। এ তিনটি বিষয় একত্রে কাজ করায় বাংলাদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা শহরে ১৫ লাখ ইঞ্জিনচলিত গাড়ি রয়েছে। দিনরাত চলাচল করছে। এরও একটা প্রভাব রয়েছে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে। স্থানীয় পর্যায়ে বিল্ডিং বাড়িয়ে দিয়েছি, জনসংখ্যার ঘনত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের কলকারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইটের ভাটাগুলো চলমান। জলাধার ভরাট করে ফেলেছি। বায়ুদূষণ হচ্ছে। দেশের উল্লেখযোগ্য বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। দিন দিন শহরাঞ্চলের গাছপালার পরিমাণ কমে গিয়ে সংকটাপন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখনই যদি দূষণের পরিমাণ কমানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে তাপমাত্রা বাড়বে। তবে তার জন্য কয়েক বছর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।’
Leave a Reply