মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাসের অমূল্য প্রামাণ্য চিত্রও। প্রতিটি দৃশ্যে রূপায়ণ করা হয়েছে স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক জীবনকে। গত ১৩ অক্টোবর ১৫৩টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। মুক্তির এক সপ্তাহ না যেতেই সিনেমাটির প্রেক্ষাগৃহ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬১। এ মুহূর্তে সারা দেশের ১৬৪টি প্রেক্ষাগৃহে চলছে মুজিব বায়োপিক। মুক্তির দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির সংখ্যা, যা এ দেশে এবারই প্রথম। ১৬৪টি সিনেমা হলেই দর্শকের রয়েছে উপচে পড়া ভিড়, যা সিনেমার ক্ষেত্রে তৈরি করেছে অনন্য ইতিহাসের রেকর্ডও। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে বিভিন্ন বয়সী, শ্রেণি ও পেশার মানুষ সিনেমা হলে এসেছেন। কেউ কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সিনেমাটি উপভোগ করেছেন। সিনেমায় বঙ্গবন্ধুর বাবা-মাসহ পুরো পরিবার নিয়ে অনেক অজানা ইতিহাস উঠে এসেছে এবং দর্শকদের হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। সিনেমাটি দেখে দর্শকরা কেঁদেছেন, বাকরুদ্ধ হয়েছে অনেকে। আবার অনেক দর্শকের মনে আরও গেঁথে গেছেন বঙ্গবন্ধু। সামনে থেকে জাতির পিতাকে যারা দেখার সুযোগ পাননি তারাই এখন হলে গিয়ে জাতির পিতাকে দেখে আবেগাপ্লুত হচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু, মহাত্মা গান্ধী, মার্টিন লুথার কিং, নেলসন ম্যান্ডেলার মতো মহান মানুষদের জীবনী একটি চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তোলা দুরূহ হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এ সিনেমাটি বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে যুগে যুগে জাগ্রত রাখবে এবং মানবতার জন্য আত্মনিবেদনের প্রেরণা জোগাবে। বৃহস্পতিবার বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে সন্ধ্যা ৭টার শোটি অন্যান্য দশর্কদের সঙ্গে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধিও দেখেন।
‘মুজিব:একটি জাতির রূপকার’ ছবির একেবারে শেষের মুহূর্ত। পর্দায় ভেসে ওঠল ১৫ আগস্টের সেই মন খারাপের দৃশ্য। কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য ঢুকে পড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে। এরপর মুহুর্মুহু গুলি। সেই গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে লুটিয়ে পড়েন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দেওয়া মহান মানুষটি সপরিবারে মারা যাওয়ার সেই দৃশ্যায়ন দেখতে দেখতে আর আবেগ সামলে রাখতে পারেননি সিনেমা হলে পর্দার সামনে বসা দর্শকরা। সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে অনেকেই কেঁদেছেন। দর্শক গ্যালারিতে যেদিকে তাকাই, শুধুই কান্নার শব্দ এবং চোখ মুছার দৃশ্য। শো শেষ হতেই হলভর্তি দর্শক বের হওয়া শুরু করলে অনেককে কাঁদতে কাঁদতে বের হতে দেখা যায়। শাম্মী আক্তার নামে একজন দর্শক আসেন তার সন্তানকে নিয়ে। সিনেমাটি দেখার পর অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আসলে প্রত্যাশার চেয়েও বেশিকিছু পেলাম। মনে হলো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি সিনেমা তো এমনই হবে। আমার সন্তানকে নিয়ে এসেছি আমাদের জাতির পিতাকে পর্দায় দেখাতে। আমাদের নতুন প্রজন্মের উচিত সিনেমাটি দেখা। যেহেতু বই পড়ার চর্চা এখন কমে গেছে, সেই জায়গা থেকে এই সিনেমায় যেহেতু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অনেক তথ্যই উঠে এসেছে তাই অনেক বিষয় জানা যাবে। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা দেখে আমরা চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’
রবিউল নামের এক যুবক বলেন, ‘জাতির পিতাকে আমরা এতদিন পড়ে জেনেছি, এবার সিনেমার পর্দায় তাকে দেখে ভিন্ন এক বঙ্গবন্ধুকে মনে হয় চিনলাম। যা পড়েছি সেই ঘটনাগুলো যেন চোখের সামনে দেখছি।’
ছোট-বড় সকল দর্শকের মুখে প্রশংসা সিনেমাটি নিয়ে। কেউ বলছেন কেঁদেছেন আবার কারও মনে আরও গভীরভাবে গেঁথে গেছেন বঙ্গবন্ধু। এটিই হয়তো একটি সিনেমার সার্থকতা। সিনেমাটি দেখে মুগ্ধ ষাটোর্ধ বয়সী খলিলুর রহমান। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের তুলে ধরেছে চলচ্চিত্রের পর্দায়। সেসব দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতাদের জীবনী সুনিপুণভাবে সিনেমায় উঠে এসেছে। এ ধরনের একাধিক সিনেমা হলিউড ও বলিউডসহ বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিতে দেখা গেছে। এসব ঐতিহাসিক সিনেমা বেশ দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন সিনেমা আগে নির্মিত হয়নি। এবার ঢাকাই চলচ্চিত্র তেমনই একটি ঐতিহাসিক সিনেমা পেয়ে পূর্ণ করেছে তার আজন্ম শূন্যস্থান। সিনেমাটির নাম ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’।
বসুন্ধরা সিটির স্টার সিনেপ্লেক্সে পল্লবী থেকে আসা রুহুল আমিন নামের এক যুবক বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বন্ধুরা মিলে সিনেমা হলে সিনেমা দেখতাম। সম্প্রতি বেশ কয়েকটা সিনেমা আমরা স্টার সিনেপ্লেক্সে দেখেছি। আজও পাঁচজনের একটা টিম এসে ‘মুজিব: একটি জাতির রূপকার’ সিনেমাটি দেখেছি। সিনেমায় মাধ্যমে বাস্তব চিত্র ফুটে তোলা হয়েছে। সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি আমরা।’
সিনেমাটি দেখে বের হওয়া দর্শকদের মধ্যে আরও একটি দৃশ্য চোখে পড়েছে। হল থেকে কোনো কোনো দর্শক বের হচ্ছেন, তাদের সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীরা সিনেমা দেখার অনুভূতি জানতে চাইছেন, কিন্তু তারা কথা বলতে চাইছেন না। কারণ তারা সিনেমাটি দেখে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন যে, কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। কারও কারও চোখের কোণে জল দেখা গেছে।
বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র আনিসুর রহমান বলেন, সিনেমাটিতে সত্য গল্প তুলে ধরা হয়েছে, যা দেখে কোন কোন দর্শক আঁতকে উঠেছেন। কেউ কেঁদেছেন। এভাবে মানুষ মানুষকে হত্যা করতে পারে! যিনি দেশটা স্বাধীন করেছেন তাকে এভাবে মরতে হয়েছে। তাই মনে হয়-কেউ কেউ কথা বলতে পারছে না।
দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি সিনেমা নির্মাণের দাবি উঠেছিল বিভিন্ন মহল থেকে। সবার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অবশেষে সরকার জাতির পিতাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ প্রযোজনায় সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন ভারতের খ্যাতিমান নির্মাতা শ্যাম বেনেগাল। এর নির্মাণ ব্যয় ৮৩ কোটি টাকা। বাংলাদেশ মোট অর্থের ৫০ কোটি ও ভারত ৩৩ কোটি টাকা দিয়েছে।
এদিকে এ সিনেমায় আরিফিন শুভ, নুসরাত ইমরোজ তিশা ও জায়েদ খান অভিনয়ের জন্য মাত্র এক টাকা পারিশ্রমিক নিয়েছেন। এর আগে গত বছরের ১৯ মে ফ্রান্সে ৭৫তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে সিনেমাটির প্রাথমিক ট্রেলার মুক্তি পায়। আর সেন্সর বোর্ডে আনকাট ছাড়পত্র পায় চলতি বছরের ৩১ জুলাই। সিনেমাটিতে বঙ্গবন্ধুর চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরিফিন শুভ। খন্দকার মোশতাক আহমদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফজলুর রহমান বাবু। কিশোর শেখ মুজিব চরিত্রে অভিনয় করেছেন দিব্য জ্যোতি।
এছাড়া রেণু (শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) চরিত্রে অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা, শেখ হাসিনা চরিত্রে নুসরাত ফারিয়া, শেখ রেহানা চরিত্রে সাবিলা নূর, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী চরিত্রে রাইসুল ইসলাম আসাদ, তাজউদ্দীন আহমদ চরিত্রে রিয়াজ, এ কে ফজলুল হক চরিত্রে শহীদুল আলম সাচ্চু, টিক্কা খান চরিত্রে জায়েদ খানসহ অনেকেই অভিনয় করেছেন। সিনেমাটিতে ভারতীয় শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন শ্রীজা ভট্টাচার্য, রাজেন মোদি, দেবাশীষ নাহা, সোমনাথ, কৃষ্ণকলি গাঙ্গুলি, আবির সুফি, অরুণাংশু রায় প্রমুখ। সিনেমার চিত্রনাট্য রচনা করেছেন শামা জাইদি ও অতুল তিওয়ারি। সিনেমাটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের ‘বিএফডিসি’ (বাংলাদেশ) ও ভারতের ‘এনএফডিসি’। এটি বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় করা হয়েছে। সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ২ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট। এই সিনেমার একমাত্র গান ‘অচিন মাঝি’ লিখেছেন জাহিদ আকবর। এতে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছেন শান্তনু মৈত্র; যিনি চলচ্চিত্রটির সঙ্গীত পরিচালকও। গত ১২ অক্টোবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভে বায়োপিকটির প্রিমিয়ার শো দেখেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা।
Leave a Reply