বিশেষ প্রতিনিধি :কমল কুমার শীল
আর স্টার টিভি
*বিশেষ প্রতিবেদন*
সদ্য প্রকাশিত মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে এক চরম নিরাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। সারা দেশের ৩১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। অর্থাৎ, এসব প্রতিষ্ঠানের পাসের হার ‘শূন্য’। শিক্ষার মান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এ নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করছেন অভিভাবক, শিক্ষাবিদ ও সাধারণ জনগণ।
### অভিভাবকদের বুকফাটা কান্না ও তীব্র ক্ষোভ
ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা তাদের তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। সারা বছর সন্তানের পেছনে কষ্টার্জিত টাকা ঢেলে এমন হতাশাজনক ফলাফলে দিশেহারা তারা।
ঠাকুরগাঁওয়ের এক অকৃতকার্য পরীক্ষার্থী অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“আমরা দিন এনে দিন খাই। মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাই একটা ভালো ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু বছর শেষে ফলাফল ‘শূন্য’! শিক্ষকরা যদি স্কুলেই ঠিকমতো না পড়ান, তবে এমন স্কুল রেখে লাভ কী? এদের বিরুদ্ধে কি কোনো বিচার হবে না?”
অপর এক শিক্ষার্থী অভিভাবক *মোসাম্মৎ রিনা বেগম* অশ্রুসজল চোখে বলেন,
“মেয়েটা দিন-রাত বই নিয়ে বসে থাকত, কিন্তু স্কুলে তো ঠিকমতো ক্লাসই হতো না। শিক্ষকরা মাস শেষে বেতন তোলেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যে অন্ধকারে তলিয়ে গেল—তার দায় কে নেবে? আমাদের সব কষ্টই আজ জলে গেল।”
—
### সুশীল সমাজ ও শিক্ষাবিদদের বক্তব্য
দেশের সুশীল সমাজ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা এই ফলাফলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, নিয়মিত তদারকির অভাব, অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং জবাবদিহিতা না থাকার কারণেই এই বিপর্যয়।
শিক্ষাবিদদের প্রধান বক্তব্য:
* *অবকাঠামো ও যোগ্যতার অভাব:* অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ও যোগ্য শিক্ষক নেই, নামকাওয়াস্তে প্রতিষ্ঠান খুলে রাখা হয়েছে।
* *জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি:* কোনো প্রতিষ্ঠান খারাপ ফল করলেও তাদের ওপর কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
* *পড়াশোনার মান:* পাসের হারের কৃত্রিম পরিসংখ্যানের চেয়ে শিক্ষার প্রকৃত মানের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
### দেশের অর্থ ও সম্পদের অপচয়
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শূন্য পাসের প্রতিষ্ঠানগুলোর পেছনে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব ও দেশের কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে।
* *সরকারি অর্থের ক্ষতি:* এমপিওভুক্ত বা অনুদানপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের পেছনে প্রতি মাসে মোটা অংকের সরকারি তহবিল ব্যয় হয়, যা শেষ পর্যন্ত শূন্য ফল দিচ্ছে।
* *মানবসম্পদের ক্ষতি:* হাজার হাজার শিক্ষার্থীর জীবনের একটি মূল্যবান বছর নষ্ট হচ্ছে, যা দেশের জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বাধা।
### শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
এই নজিরবিহীন ফলাফলের পর কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, শূন্য পাস করা ৩১২টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হচ্ছে।
*মন্ত্রণালয়ের গৃহীত ও সম্ভাব্য পদক্ষেপসমূহ:*
১. *কারণ দর্শানোর নোটিশ:* এসব প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করে উপযুক্ত ব্যাখ্যা চাওয়া হচ্ছে। জবাব সন্তোষজনক না হলে একাডেমিক স্বীকৃতি ও পাঠদানের অনুমতি বাতিল করা হবে।
২. *এমপিও স্থগিত বা বাতিল:* যেসব প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত, তাদের সরকারি অনুদান স্থগিত এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে বাতিল করার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে।
৩. *তদন্ত কমিটি:* অকৃতকার্য হওয়ার পেছনে মূল দায় কার—তা চিহ্নিত করতে প্রতিটি জেলায় তদন্ত দল কাজ করবে।
*উপসংহার:*
শিক্ষাকে দেশের মেরুদণ্ড বলা হলেও, জবাবদিহিতাহীন এমন প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনগণের এক দাবি—শুধু কাগুজে তদন্ত নয়, শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।
Leave a Reply