প্রতিবেদক: কমল কুমার শীল, আর স্টার টিভি (বদলগাছী, নওগাঁ)
বিশেষ প্রতিনিধি ; প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০২৬
মানিকগঞ্জ: দেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ভুয়া মামলা ও পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা। আইনের অপব্যবহার করে প্রবাসে অবস্থানরত স্বামীর বিরুদ্ধে দেশে মিথ্যা যৌতুক মামলা দায়েরের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় লাভলী আক্তার নামে এক নারীকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পেয়েছেন তার প্রবাসী স্বামী আরিফুল ইসলাম রতন।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) মানিকগঞ্জের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক দোলন বিশ্বাস নথিপত্র ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে এই তাৎপর্যপূর্ণ রায় প্রদান করেন।
ঘটনার নেপথ্য ও কাল্পনিক অভিযোগের প্রমাণ
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে আরিফুল ইসলাম রতনের বিরুদ্ধে ‘যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮’-এর ৩ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন তার স্ত্রী লাভলী আক্তার। এজাহারে দাবি করা হয়েছিল, ২০২২ সালের ১৫ এপ্রিল স্বামী আরিফুল ইসলাম পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করে স্ত্রীকে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করেন।
তবে বিচারপ্রক্রিয়ায় বের হয়ে আসে জালিয়াতির চরম সত্য। আদালতের দাপ্তরিক নথিপত্রে প্রমাণিত হয়, যে ঘটনার ওপর ভিত্তি করে মামলাটি করা হয়েছিল, সেই সময় আসামি আরিফুল ইসলাম রতন বাংলাদেশেই ছিলেন না। তিনি ২০২১ সালের ৮ এপ্রিল চাকরির উদ্দেশ্যে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন এবং দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে ২০২৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন। অর্থাৎ ঘটনার কথিত তারিখে তিনি বিদেশে অবস্থান করছিলেন।
আদালতের কঠোর পদক্ষেপ
ঘটনার সময় আসামি বিদেশে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে গত ২৭ জুলাই আদালত আরিফুল ইসলাম রতনকে মামলা থেকে সম্পূর্ণ বেকসুর খালাস দেন।
এরপর মিথ্যা মামলা দিয়ে একজন নির্দোষ প্রবাসীকে হয়রানি করার অপরাধে, আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতে যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৬ ধারায় বাদী লাভলী আক্তারকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দেন বিচারক।
আইনজীবীদের বক্তব্য
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন কোহিনুর:
“আসামি ঘটনার সময় প্রবাসে থাকায় স্পষ্ট প্রমাণিত হয় মামলাটি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আদালত আসামিকে খালাস দেওয়ার পর আমরা বাদীর বিরুদ্ধে শাস্তির আবেদন জানাই। শুনানি শেষে বিচারক আইন অনুযায়ী বাদী লাভলী আক্তারকে ১০ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সমাপ্তি আক্তার:
“আদালত ১০ দিনের সাজা প্রদান করায় আপিলের শর্তে জামিনের আবেদন জানানো হয়। বিচারক এক মাসের মধ্যে আপিল করার শর্তে ১,০০০ টাকা বন্ডে জামিন মঞ্জুর করেছেন।”
বিশেষ স্থানিক বিশ্লেষণ: ‘তারিখের পর তারিখ’ ও দ্রুত বিচারে প্রতিকারের দাবি
মানিকগঞ্জ জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহাবুবুল ইসলাম বলেন, “মিথ্যা মামলা দিয়ে কাউকে হয়রানি করলে বাদীকেও যে সাজার মুখোমুখি হতে হয়, বিচারক দোলন বিশ্বাসের এই রায় সমাজে একটি বলিষ্ঠ বার্তা দেবে।”
তবে সাংবাদিক কমল কুমার শীলের বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে ভুক্তভোগীদের চরম ভোগান্তির কথা। বর্তমানে যৌতুক ও নির্যাতন আইনকে ঢাল বানিয়ে পুরুষ নির্যাতনের ঘটনা নিত্যদিনের চিত্রে পরিণত হয়েছে।
আদালতে ‘তারিখের পর তারিখ’ পড়ার কালপ্রথার কারণে নির্দোষ ব্যক্তিদের বছরের পর বছর কোর্টের বারান্দায় দৌড়াতে হয়, যার ফলে জীবন থেকে মূল্যবান সময় ও কষ্টার্জিত অর্থ নষ্ট হয় এবং পরিবারগুলো মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে।
সমাজ সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের জোর দাবি— পুরুষ নির্যাতন বন্ধে এই ধরনের ভুয়া মামলাগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে এবং মিথ্যা মামলাকারীদের জন্য নামমাত্র সাজা না রেখে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।
Leave a Reply