আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার পরমুহূর্তে প্রথমে মনে পড়ল আমার বন্ধু বজলুর মুখ। যে ২০০০-০১ সালে একদিন পরম হতাশায় ডুবে গিয়ে বলেছিল, ‘আর্জেন্টিনাকে কোনোদিন জিততে দেখিনি, শুধু শুনেছি।’ পরের ২০-২১ বছরও ছবিটা খুব বদলায়নি। এ প্রজন্মের সমর্থকরা শুধু গল্পই শুনেছে। ম্যারাডোনার অতিমানব হয়ে ওঠা, তারপর রেফারিং অবিচারের প্রতিবাদে কান্না সবই শোনা কাহিনী। পত্রিকা-ম্যাগাজিনে পড়া গল্প। অধুনা ইউটিউবে সেসব ছবি দেখেও দুঃখের ক্ষত শুকায়নি। হাহাকার বেড়েছে। আবার কবে! আর কি কোনোদিন…
মেসিরা উল্লাস করছে। অদ্ভুত ব্যাপার, সব আড়াল হয়ে আমার কাছে আবছা হয়ে ভাসছে বন্ধু মাহবুবের মুখ, আর্জেন্টিনার খেলার সময় যাকে দুই-তিনজন ধরে রাখত। না হলে সব চুরমার করে দিতে পারে হতাশার প্রকাশে। ১৯৯৮ সালে আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ডসের কাছে হারার পর তিন দিন সে হাসেনি। পরে, আয়োজন করে তাকে হাসানো হয়েছিল মুহসীন হলের সামনের মাঠে। ও এমন অবিশ্বাস্য ফুটবল দর্শক যে অর্জেন্টিনার ম্যাচে দলের গোলকিপারের হাতে বল, মাহবুব দেখি দোয়া-দরুদ পড়ছে, ‘রক্ষা করো, উফ…মা…।’ সাধারণত সমর্থকদের কাছে নিজের দলের গোলকিপারের হাতে বল থাকার এ সময়টাই একটুখানি স্বস্তির। তাহলে? মাহবুবের উত্তর, ‘এই যদি গোলকিপার লম্বা শট করার পর ওদের একজন বল ধরে গোল দিয়ে দেয়।’ মাহবুব এখন কানাডায়। বজলু ইংল্যান্ডে।
আর আমাদের অমিত দা অন্যলোকে। দেশ রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক অমিত হাবিব ছিলেন ঘোর আর্জেন্টিনা সমর্থক, এতটাই যে, সেই জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেই শুরু করেছিলেন তুমুল বিশ্বকাপ উন্মাদনা। দাদা চলে গেলেন জুলাইতে। স্বাভাবিক নিয়মে বিশ্বকাপ এলে দেখে যেতে পারতেন নিজের চিরদিনের স্বপ্নের দৃশ্য। দেখলেন না। বা হয়তো অন্যলোক থেকে দেখলেন। এভাবেই এদেশ-ওদেশ, এলোক-অন্যলোক, শরীরে-অশরীরে মিলে গেল মেসির উৎসবে। রেশ ছড়াল পুরো দুনিয়াতে। সামনে বসে কাজ করতে করতে কাঁদল সহকর্মী রাসেল, ৩৬ বছরের ব্যথা ভাসল হাউমাউ কান্নায়। সজীব আবেগের উত্থান-পতন শেষে ভাষা হারিয়ে ঘোষণা করে দিল বিজয় ভোজের (যদিও এখনো সেটা হয়নি, হবে হবে করছে)।
ফাইনাল শেষে পত্রিকা নতুন করে বিন্যাস শেষে বাসায় ফিরছি ভোররাতে। মনে হচ্ছে তেমন কেউ ঘুমাচ্ছে না। চারদিকে ৩৬ বছরের গুমোট হাওয়া কেটে যাওয়ার রেশ! কী অদ্ভুত ব্যাপার, কোথাকার কোন আর্জেন্টিনা, যেখানে বাংলাদেশ থেকে যেতে তিনবার প্লেন বদলাতে হয়, ওরা যে ভাষায় কথা বলে সেই ভাষা জানে না দেশের ৯৯.৯৯ ভাগ মানুষ, তবু কী একাকার! শর্তহীন এ ভালোবাসা অর্থহীন মনে হয়।
আর মনে হতে হতে এ-ও মনে হয়, আমিও কি এই পাগুলে অপেক্ষার একজন নই! কৈশোরের ম্যারাডোনাপ্রেম সময়ে ফিকে হয়েছে। নায়ক ফুটবল ছেড়েছেন, এমনকি পৃথিবীও ছেড়েছেন। ক্রীড়া সাংবাদিকতা পেশা বলে আবেগ সংবরণ শিখেছি। ম্যারাডোনা-মেসির যুগলবন্দির ২০১০ বিশ^কাপে জার্মান যন্ত্রে চোখের সামনে পিষ্ট হওয়া দেখেও লিখতে বসে গেছি, তবু তো তলে তলে সে-ই অপেক্ষা আমারও। আর কি কোনোদিন! জীবনে কি আর দেখা হবে না! মেসি আসাতে আশা। তারপর দুই বিশ্বকাপে হতাশা এবং এখন ফুটবল জীবনের বার্ধক্যে পৌঁছা মেসিতে আর সূর্যোদয় সম্ভব? মনে পড়ে প্রথম দিন হেডিং করেছিলাম, ‘গোধূলির মেসিতে সূর্যের স্বপ্নে আর্জেন্টিনা’। গোধূলির কেউ সূর্যাস্ত আনতে পারেন। সূর্যোদয় সাধারণত নয়। অতএব…
আমার ম্যারাডোনাপ্রীতি, সেই সূত্রে আর্জেন্টিনাপ্রেম এবং তারই রেশে মেসিমাদকে আচ্ছন্ন থাকার ঘটনা আমার চেনারা খুব ভালো করেই জানেন। পাঠকরাও পরিচিত কমবেশি। কিন্তু এটা বোধহয় জানেন না, একসময় আমি তুখোড় ব্রাজিল সমর্থক ছিলাম। তুখোড় বলতে ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে জিকোর পেনাল্টি মিসে কেঁদে ফেলা ব্রাজিল সমর্থক। এমনকি তেমন কারও হয়তো মনে নেই, ১৯৮৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অলিম্পিক ফাইনালে ব্রাজিল শুরুতে এগিয়ে গিয়েও যে হেরেছিল তাতে প্রচন্ড বিষন্ন হয়ে রাতে আর কারও সঙ্গে কথাই বলতে ইচ্ছে হয়নি। এবং আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপ জিতে, ম্যারাডোনা কাপে চুমু খাচ্ছেন, তখনো আমার মনে সেই হতাশা, ‘উফ! জিকো যদি পেনাল্টিটা মিস না করতেন তাহলে আজ হয়তো সেই জায়গায় এদিনহো…(সেবারের অধিনায়ক)।’ তবে হ্যাঁ, প্রিয় খেলোয়াড় তখনো এক এবং অদ্বিতীয় ম্যারাডোনা। ১৯৮২ বিশ্বকাপের কিছু দৃশ্য দেখেই অমরপ্রেম, না হওয়ার কোনো সুযোগই আসলে ছিল না আমাদের প্রজন্মের। কাজেই সমীকরণটা এরকম, প্রিয় দল ব্রাজিল যেহেতু সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল খেলে। প্রিয় খেলোয়াড় ম্যারাডোনা, যেহেতু তিনি সবচেয়ে ভালো ফুটবল খেলেন। পুরো দেশের সমর্থনের ধারাটা এমনই। কোনো ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ভাগ নেই, কোনো রেষারেষি নেই। ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর দেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ আর্জেন্টিনা তথা ম্যারাডোনার পক্ষে। পরের কয়েক বছরও আমার ফুটবলবোধ এমনই, আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হলেও আমি ব্রাজিল। ১৯৯০ বিশ্বকাপ শুরুও করলাম ব্রাজিল সমর্থক হিসেবে। শেষ করলাম ম্যারাডোনার কান্নার সঙ্গী হয়ে। কারণ, দুই প্রিয় মুখোমুখি হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল মুখোমুখি। আমি ম্যাচ শুরু পর্যন্ত ব্রাজিল। ক্যাডেট কলেজের অডিটরিয়ামে গ্যালারি আলাদা, ব্রাজিল গ্যালারিতেই বসা, এ সময় আর্জেন্টিনার জাতীয় সংগীত বাজছে। ক্যামেরা জুম করল ম্যারাডোনাকে। সেই মুখ থেকে বিদ্যুচ্চমকের মতো মাথায় এলো, হেরে গেলে আজই ম্যারাডোনার শেষ! আর কোনো দিন হয়তো ম্যারাডোনাকে খেলতে দেখব না (তখনকার স্যাটেলাইটহীন জীবনে বিশ্বকাপই তাদের দেখার একমাত্র ভরসা)। ব্যস, আমার দুনিয়া উল্টে গেল। দল ত্যাগ করলাম, নাটকীয়ভাবে গ্যালারি বদলালাম, আর্জেন্টিনার সমর্থকরা পরম ভালোবাসায় আমাকে টেনে নিল। শুরু হলো, ৩৬ বছরের দুঃখময় পথচলা। যতবার আর্জেন্টিনা হতাশায় ডুবিয়েছে, ততবারই ম্যারাডোনাকে মনে করেছি। সেই দুঃখ শেষ। ২০১০ বিশ্বকাপে হারার পর সংবাদ সম্মেলনে ম্যারাডোনা। বিদায়ী শোকগাথা লিখতে হাজির। ম্যারাডোনা স্প্যানিশে দুঃখ উগড়ে দিচ্ছিলেন, আমার কাছে কিন্তু সেগুলো প্রলেপ। মনে হচ্ছিল, এক ম্যারাডোনার কাছে যে ফুটবলীয় ঋণ তার বিনিময়ে এমন হাজারও হার সহ্য করা যায়। কিন্তু তারা কী করবে যারা ম্যারাডোনাকে দেখেনি। ম্যারাডোনা কীর্তির রেশে আর্জেন্টিনা সমর্থন করেছে, কী সান্তনা হয় তাদের! তারা বজলু হয়ে দুঃখ বয়ে নিয়ে চলে। আর চলে অপেক্ষা। ৩৬ বছর কাটল। শেষে আর্জেন্টিনা কথা রাখল।
এলেন মেসি। ম্যারাডোনার জাতিস্মর হয়ে। কেউ বিশ্বাস করে না। নকল ম্যারাডোনাদের দেখে দেখে এমন অবিশ্বাস যে তাকেও স্যাভিওলাদের দলে ফেলার ভুল করে বসেছিলেন কেউ কেউ। আমিও খুব উচ্ছ্বাস বোধ করিনি। প্রথম সরাসরি দেখি ২০০৫ অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ ফাইনালে। দুটো গোল করেছিলেন, ঠান্ডা মাথার পেনাল্টিতে, গোল্ডেন বল-বুট সব হলো কিন্তু সেসব তুচ্ছ অঙ্ক ছাপিয়ে চোখ আটকাল অবিশ্বাস্য ক্লোজ কন্ট্রোলে। শরীরে আলাদা, ধরনে প্রায় বিপরীত কিন্তু বল পায়ে গেলেই সেই ঐশ্বরিক কন্ট্রোল। চুম্বক হয়ে বল লেগে থাকছে পূর্বসূরির মতো, যেন কথা বলে চলছে পোষমানা পাখির মতো। ম্যারাডোনা হওয়ার প্রশ্ন নেই কিন্তু কোথাও যেন তিনিই ম্যারাডোনার পুনর্জন্মের ছবি। পরের কয়েক বছরে তার ম্যারাডোনা হয়ে ওঠা। এবং একসময় ছাপিয়ে যাওয়া। এর মধ্যে অবাক ব্যাপার, ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ কভার করতে গিয়ে দেখি ইউরোপিয়ান ফুটবল যেন মোটামুটি মেনেই নিয়েছে মেসিই সর্বকালের সেরা। তাদের বিবেচনায় অবশ্য ক্রুইফ-ডি স্টেফানো কখনো কখনো পেলে-ম্যারাডোনার চেয়ে এগিয়ে। তখনই হয়তো নয় কিন্তু সত্যি বললে, ফুটবল ক্ষমতায় তিনি ম্যারাডোনা কেন, সবাইকেই ছাপিয়ে গিয়েছেন বেশ আগে। সাতটি ব্যালন ডি’অর, অজস্র গোল, রেকর্ড ইত্যাদি হয়েছে কিন্তু এসবই আসলে তুচ্ছ অঙ্ক। মেসির মাহাত্ম্য এর চেয়েও গভীরে। এর চেয়েও বিস্তৃত পরিসর। ফুটবলের মতো অবাধ্য গোলককে যিনি পায়ের অংশ বানিয়ে ফেলতে পারেন, না দেখেও যিনি দেখে নিতে পারেন পুরো মাঠ, পরের মুহূর্তটা যিনি জেনে ফেলেন আগেই, বলে যার প্রতিটি স্পর্শই উদ্দেশ্যম-িত, যার পাস ভাবনায় জটিল কিন্তু প্রয়োগে প্রাঞ্জল, গোল করার সমান সুখ যিনি পান করানোতে না, ফুটবলীয় ক্ষমতায় মহামতি পেলে-মহান ম্যারাডোনাও তার পেছনে। ফোর ফোর টু তাই সব সংস্কার তুচ্ছ করে তাকেই ঘোষণা করে শতাব্দীসেরা, ম্যাথিউস বলেন হাজার বছরের সেরা, আর্সেন ওয়েঙ্গার অনেক বছর আগে একটু ভেবে বলেন, সর্বকালের সেরার নাম মেসি। সেই মেসির বিশ্বকাপ জেতা, যা তিনি জীবন দিয়ে জিততে চেয়েছিলেন, সেটা নিশ্চয়ই বিশাল ঘটনা। কিন্তু আমার কাছে অতটা নয়, এবং একটুও মনে করি না এতে করে তিনি সর্বকালের সেরা হলেন। ফুটবল একটা দলীয় খেলা, ব্যক্তির বিচার দলীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সবসময় করা যায় না। মেসি যদি আফ্রিকান কোনো দলের হতেন, কোনো দিন কি বিশ্বকাপ জিততেন? সুইডেন-সুইজারল্যান্ডের মতো মাঝারি দলের হলেও সেই সুযোগ থাকত না। তাহলে এসব দেশের কেউ একজনের কি অধিকার নেই সেরা ফুটবলার হওয়ার। এই বেঠিক বিচারের মানদ- আরও বেঠিক হয়ে ওঠে যখন বিশ্বকাপ দিয়ে বিচারের চেষ্টা হয়। বিশ্বকাপ লিগভিত্তিক খেলাও নয়, একটা টুর্নামেন্ট, যেখানে কোনো গোল না করে, কোনো ম্যাচ না জিতেও তাত্ত্বিকভাবে কারও পক্ষে চ্যাম্পিয়ন হওয়া সম্ভব। সম্ভব খুব ভালো খেলে একদিনের সামান্য একটা ব্যর্থতায় বাদ পড়ে যাওয়া। এবার আর্জেন্টিনা যেমন চ্যাম্পিয়ন হলো তেমন তো ২০১৪-তেও হতে পারত, হিগুয়েইনের একটা ব্যর্থতায় মেসির শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত বা বিনষ্ট হওয়ার যুক্তি নেহাত বাজারি ভুল। বোধের বিন্যস্ত প্রকাশ অবশ্যই নয়। এবার এত কিছুর পরও এমি মার্তিনেজ টাইব্রেকারে দুর্ভেদ্য না হলে হয়তো আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় না, তাহলে কি মার্তিনেজের মাধ্যমে মেসির সর্বকালের শ্রেষ্ঠত্বে উত্তরণ হলো! এ বিচারের কী মানে যে বিচার তৃতীয়পক্ষভিত্তিক। গোল আর অঙ্ক, অদ্ভুতুড়ে সাফল্যের নেশা ফুটবলীয় বোধ নষ্ট করে দিয়েছে বলেই তেলে সান্তানারা আর কোচ হন না, ১৯৮২-এর গৌরবময় ব্রাজিল ফেরে না, হেরে গিয়েও ৩০ দশকের অস্ট্রিয়া, ৫৪-এর হাঙ্গেরি, ৭৪-এর নেদারল্যান্ডসের মতো অমর হয় না কোনো দল। মাঝেমধ্যে মনে হয় ভুল ফুটবলবোধ আর বেঠিক বিচারধারা ফুটবলকে বিপথেই নিয়ে যাচ্ছে বরং।
তাহলে মেসির এই কাপ জেতা, দুনিয়া ছাড়ানো উল্লাসময় বিশ্বকাপ ট্রফির মানে নেই কোনো? আছে। মেসি গত দেড় দশক ফুটবলকে যা দিয়েছেন, প্রতি তিন-চার দিন পর যে বিনোদনের পসরা সাজিয়েছেন, তাতে বিশ্ব ফুটবল একটা ঋণে পড়ে গিয়েছিল। বিশ্বকাপ দিয়ে সেই দেনাটা শোধ হলো আসলে। আমরা তাই শিরোনাম করেছিলাম ‘মেসিকে ঋণ শোধ পৃথিবীর’।
পৃথিবীর তো ঋণ শোধ হলো, বাংলাদেশের কী হলো! ২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ?’
‘সেই দেশ, যে দেশে আর্জেন্টিনার সমর্থকসংখ্যা আর্জেন্টিনার চেয়ে বেশি।’
‘মানে?’
‘তোমার দেশের আর্জেন্টিনার সমর্থক কত? মোট জনসংখ্যা যত। সাড়ে ৩-৪ কোটি। আর আমার দেশে সেটা কমপক্ষে ৮ কোটি। ১০-১২ও হতে পারে।’
‘কীভাবে?’
‘আমাদের মোট মানুষ ১৬-১৭ কোটি, এর অর্ধেক বা তারও বেশি আর্জেন্টিনার সমর্থক।’
‘বলো কী? কোন দেশ?’
সেই সাংবাদিকটি তরুণ। ইতিহাস তেমন জানতেন না। দেখলাম, আর্জেন্টিনার সিনিয়র সাংবাদিকরা বাংলাদেশের আর্জেন্টিনাপ্রেম ভালোই জানেন। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের সংসদে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের ক্ষোভে রেফারিকে তুলোধুনো, কোদেসালের কুশপুত্তলিকা দাহ এসব তাদের জ্ঞানে আছে। আর তাই মনে হচ্ছিল, আর্জেন্টিনা-বাংলাদেশ ফুটবলীয় সূত্রে একটা সম্পর্ক সম্ভব।
এবার সেটা সত্য হতে যাচ্ছে। সত্য করার পথে বিরাট ভূমিকা রেখেছে আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান নগদ। যে আর্জেন্টিনাপ্রেম তীব্রভাবে থাকে ফেইসবুকের পাতায় কিংবা ঘরের সীমানায়, সেটা তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই ছড়িয়েছে বিস্তৃত মাঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই আয়োজিত খোলা মাঠে খেলা দেখার আয়োজনে বিশাল আর্জেন্টিনা সমর্থকগোষ্ঠী এবং তাদের প্রতিক্রিয়া বিশ্ব মিডিয়া হয়ে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনায়। ভৌগোলিক দূরত্ব দূর হয়ে গেছে হৃদয়ের সংযোগে। আর্জেন্টিনা কৃতজ্ঞতা থেকে বাড়িয়েছে সহায়তার হাত। জমছে কূটনীতি। শুধু ফুটবল সমর্থন করে এমন অর্জনে পৃথিবীতে বাংলাদেশই কি প্রথম! নগদকে ধন্যবাদ এমন আয়োজনের জন্য। করপোরেট সংস্থা নানা কিছু করে নিজেদের বিপণনের প্রয়োজনে, সেটা যখন হয়ে ওঠে জাতীয় প্রাপ্তির উপায়, তখন সেই উদ্যোগকে কুর্নিশ করতেই হয়।
আর মেসির বিশ্বকাপ জয়! আমার কাছে আরেকটা মাহাত্ম্য আছে। এর ফলে মেসি এখনই অবসর না নিয়ে আরও কিছুদিন জাতীয় দলে খেলবেন। আমেরিকায় ঠেলে দেওয়ার ফুটবলীয় কুবুদ্ধিও দূরে সরবে; ইউরোপিয়ান জমজমাট লিগে সচল থাকবেন আরও বেশ কিছুদিন। মানে মেসির ফুটবল দেখার সুযোগ আরও বাড়ছে। আবার বলি গোলের মালা, ব্যালন ডি’রের ডালি এগুলো মেসির বিবেচনায় অঙ্ক। অলংকার নয়।
মেসির মাহাত্ম্য, তার পায়ে ফুটবল ফুল হয়ে ফোটে। ফুটবলের সঙ্গে তার প্রেম দেখে ব্যর্থ প্রেমিকও জীবনের মানে খুঁজে পায়। বিপন্ন মানুষও হেসে ওঠে সব যন্ত্রণা ভুলে। পৃথিবীর ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা ব্যর্থরাও মনে করে আরে, বেঁচে থাকার মানে তো আছে!
সব অঙ্ক-বিশ্লেষণ বন্ধ করুন। মেসিপ্রেমী হন আর বিরোধী, ফুটবল ভালোবাসুন আর উপেক্ষা করুন, মেসিকে দেখতে থাকুন। এ সুযোগ সবার। এবং এ সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য।
এ জিনিস পৃথিবী আগে কোনো দিন দেখেনি। এ জিনিস আর কোনো দিন দেখবেও না।
Leave a Reply