কমল কুমার শিল, বদলগাছি (নওগাঁ) | আর স্টার টিভি
বিশেষ প্রতিবেদন:
বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ক’জন তরুণ নিজেদের মেধা, সাহসিকতা ও ত্যাগ দিয়ে জাতীয় চেতনাকে নাড়া দিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম শহীদ শরীফ ওসমান বিন হাদী। ২০২৪ সালের রক্তঝরা জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যিনি মেহনতি মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন, আজ তাঁকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছে দেশের আপামর জনগণ।
গরিবের অধিকার ও ‘পান্তা-ইলিশের’ সামাজিক বৈষম্য
ওসমান হাদী সবসময় সমাজের নিম্নবিত্ত ও খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন। পহেলা বৈশাখের প্রচলিত ‘পান্তা-ইলিশ’ সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর ক্ষুরধার বক্তব্য সামাজিক বৈষম্যের করুণ চিত্র উন্মোচন করেছিল। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ পেটের তাগিদে ও অভাবের কষ্টে পান্তা খায়, কোনো বিলাসী ফ্যাশন হিসেবে নয়। কিন্তু বৈশাখের দিনে সেই পান্তা-ইলিশই যখন ধনীদের লোকদেখানো বিলাসে পরিণত হয়, তখন আকাশচুম্বী দামের কারণে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ইলিশ কিনে খাওয়া তো দূরের কথা, চোখের দেখাও দেখতে পায় না। গরিবের অভাবকে নিয়ে ধনীদের এই কৃত্রিম সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈষম্যের তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।
ইতিহাসের আসল হিরোদের পুনরুজ্জীবন
বাঙালি তরুণদের আত্মমর্যাদাবোধ ফিরিয়ে আনতে তিনি সবসময় ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যের আসল বিপ্লবীদের স্মরণ করতেন। নীলকর ও জমিদারি শোষণের বিরুদ্ধে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার বীরত্বগাথা, হাজী শরীয়তুল্লাহ ও দুদু মিয়ার ফরায়েজী আন্দোলন এবং নবাব সলিমুল্লাহর রাজনৈতিক ও শিক্ষাবিস্তারের দূরদর্শী ভূমিকার কথা তিনি প্রায়ই তুলে ধরতেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল তরুণ প্রজন্মকে তাঁদের ঐতিহাসিক মূল ও আধিপত্যবাদবিরোধী আত্মমর্যাদার সাথে পুনর্সংযুক্ত করা।
স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা ও ‘ইনসাফ’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থা নিয়ে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও সাহসী। তিনি বিশ্বাস করতেন, বিদ্যমান আইন ও বিচার বিভাগ বহু বছর ধরে দলীয় স্বার্থে ও ক্ষমতাবানদের রক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ন্যায়বিচার পান না। তিনি একটি সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত, দ্রুত ও সর্বজনীন ‘ইনসাফভিত্তিক’ বিচার ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিলেন, যেন রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক আইনের সমান আশ্রয় পায়।
৩৬শে জুলাইয়ের বিপ্লব ও ‘ইনকিলাব মঞ্চ’
‘৩৬শে জুলাই’ বা ৫ই আগস্টের ঐতিহাসিক বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পর বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ও চেতনা যাতে পথ না হারায়, সেজন্য তিনি ২০২৪ সালের ১৩ই আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গড়ে তোলেন। সীমান্ত হত্যা প্রতিরোধ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা, শোষণের অবসান এবং মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন আপসহীন এক সিপাহসালার।
নির্মম হত্যাকাণ্ড ও বীরের প্রস্থান
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার এই আপসহীন কণ্ঠস্বরকে নীরব করে দিতে বেছে নেওয়া হয় সহিংসতার পথ। ২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় নির্বাচনি প্রচারণাকালে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে ১৮ই ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই বীর শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
দেশ ও জাতির জন্য তাঁর এই দূরদর্শী নেতৃত্ব, আত্মত্যাগ ও আপসহীন লড়াই তরুণদের মাঝে এক চিরন্তন চেতনার জন্ম দিয়েছে। রাজপথের এই বীরের রক্তে সিঞ্চন করা বিপ্লব ও সামাজিক ইনসাফের স্বপ্ন চিরকাল শোষণমুক্ত নতুন বাংলাদেশ গড়ার মূল প্রেরণা হয়ে থাকবে।
Leave a Reply