গেলাম রাব্বনী, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি, আর স্টার টিভি:*
আইনের সমতার আড়ালে বাংলাদেশে নীরবে গড়ে উঠেছে পুরুষ নির্যাতনের এক করুণ ও ভয়াবহ বাস্তবতা। নারীদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে প্রণীত বিশেষ আইনগুলোর একপাক্ষিক ব্যবহার এবং লাগামহীন অপব্যবহারের কারণে আজ লাখো পুরুষের জীবন জঘন্য আইনি চক্করে পিষ্ট। তুচ্ছ ঘটনাতেই মিথ্যা মামলার ফাঁদ, প্রাথমিক তদন্ত ছাড়াই গ্রেফতারের আতঙ্ক এবং বছরের পর বছর কোর্টের বারান্দায় তারিখের (ডেট) পর তারিখ ঘোরার নিঃস্ব দৃশ্য প্রমাণ করে—আজকের সমাজে একজন পুরুষের স্বাভাবিক জীবন জেলের চার দেয়ালের কঠিন বন্দিদশার চেয়েও ভয়াবহ ও বিষাদময় হয়ে উঠেছে।
—
### আইনি কাঠামোর একপাক্ষিক ফাঁদ ও পুরুষের করুণ পরিণতি
* *নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন (২০০০):*
* *নারীর আইনি সুবিধা:* যৌতুক বা নির্যাতনের অভিযোগ এনে ট্রাইব্যুনালে সরাসরি কঠিন ধারায় মামলার সুযোগ।
* *পুরুষের ভয়াবহ বাস্তবতা:* আইনটির একাধিক ধারা অজামিনযোগ্য (Non-bailable) হওয়ায় অভিযোগ মাত্রই শত শত নির্দোষ পুরুষ ও তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে হাজতে যেতে হচ্ছে। বছরের পর বছর তারিখ পরিবর্তনের ফান্দে পড়ে আর্থিক ও সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হচ্ছেন তারা।
* *দণ্ডবিধি, ১৮৬০ (৪৯৭ ধারা – পরকীয়া আইন):*
* *নারীর আইনি সুবিধা:* সমানভাবে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীকে সম্পূর্ণ বেকসুর খালাস দেওয়ার অদ্ভূত আইনি ছাড়।
* *পুরুষের ভয়াবহ বাস্তবতা:* কেবল পুরুষ হওয়ার অপরাধে পরকীয়ায় একপাক্ষিক আসামি বানিয়ে কারাদণ্ড ভোগ করানো হয়, যা স্পষ্ট বৈষম্য।
* *অপ্রাপ্তবয়স্ক প্রেমের আইনি বলির পাঁঠা:*
* *নারীর আইনি সুবিধা:* নিজ ইচ্ছায় পালিয়ে গেলেও আইনত মেয়েটিকে সম্পূর্ণ ‘নিরপরাধ ও অপহৃত ভিকটিম’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
* *পুরুষের ভয়াবহ বাস্তবতা:* ১৬-১৭ বছরের কিশোর ছেলেটির যৌথ সিদ্ধান্ত থাকা সত্ত্বেও তার কপালে জুটছে ‘ অপহরণকারীর’ দাগ এবং জীবনের শুরুতেই তাকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে কড়া আইনি বিচারিক গ্যাঁড়াকলে।
* *পারিবারিক সহিংসতা ও যৌতুক নিরোধ আইন:*
* *নারীর আইনি সুবিধা:* সহজেই মানসিক ও শারীরিক সহিংসতার অজুহাতে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকার।
* *পুরুষের ভয়াবহ বাস্তবতা:* নিজ স্ত্রী বা শ্বশুরবাড়ির হাতে নৃশংস মানসিক ও আর্থিক ব্ল্যাকমেইলের শিকার হলেও পুরুষদের বাঁচানোর জন্য দেশে কোনো ‘পুরুষ নির্যাতন নিরোধ আইন’ বা বিশেষ রক্ষাকবচ নেই।
—
### এই ভয়াবহতা থেকে সাধারণ মানুষের করণীয়
* *সচেতনতা ও অকাট্য প্রমাণ রাখা:* দেনমোহর, বিবাহ ও যেকোনো সামাজিক লেনদেনের সঠিক লিখিত প্রমাণ এবং ভুয়া অভিযোগ মোকাবিলার তথ্য উপাত্ত সবসময় নিজের কাছে সংরক্ষণ করা।
* *সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা:* ভুয়া মামলা দেওয়া ব্ল্যাকমেইলারদের সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং মামলা রুজুর আগেই স্থানীয়ভাবে নিরপেক্ষ শালিসের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা।
* *অন্যায় আইনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া:* আইনি বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় পুরুষ অধিকার ও আইনি সুরক্ষার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা।
—
### রাষ্ট্রে জরুরি পরিবর্তন ও সরকারের প্রতি জরুরি আহ্বান
১. *পুরুষ নির্যাতন নিরোধ আইন প্রণয়ন:* অবিলম্বে পুরুষদের পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট ‘পুরুষ নির্যাতন নিরোধ আইন’ প্রণয়ন এবং পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা।
২. *মিথ্যা মামলাকারীদের কঠিন শাস্তি:* ভুয়া ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রমাণিত হলে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১৭ ধারা ও যৌতুক নিরোধ আইনের ৫ ধারার কঠোর প্রয়োগ ঘটিয়ে মিথ্যা মামলাকারীকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তির আওতায় আনা।
৩. *গ্রেফতারের আগে বাধ্যতামূলক নিরপেক্ষ তদন্ত:* পারিবারিক বিরোধের ক্ষেত্রে অভিযোগ পাওয়ার সাথে সাথে গ্রেফতার বা মামলা রুজু না করে সিআইডি বা বিশেষ তদন্ত সেল দ্বারা নিরপেক্ষ প্রাথমিক তদন্ত বাধ্যতামূলক করা।
৪. *বিচারিক মেয়াদ ও তারিখের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ:* যৌতুক ও পারিবারিক মামলার নিষ্পত্তিতে সর্বোচ্চ ৩ থেকে ৬ মাসের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া, যাতে অশেষ তারিখের চক্করে পড়ে কোনো নির্দোষ পুরুষের জীবন ও ক্যারিয়ার ধ্বংস না হয়।
*উপসংহার:*
সমাজে প্রকৃত সমতা ও বিচার নিশ্চিত করতে হলে একপাক্ষিক আইনের সংশোধন এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র যদি অবিলম্বে ভুয়া মামলার বিচার ও পুরুষদের আইনি সুরক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেয়, তবে এই নীরব নির্যাতন দেশের পারিবারিক কাঠামোকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেবে।
Leave a Reply