জর্জ হ্যারিসন ও দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ।
**************************************
এক.
আমাদের একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে ১৯৭১ সালের ১ আগস্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’। পণ্ডিত রবিশংকর মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্বজনমত গড়ে তোলা এবং শরণার্থীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তাঁর শিষ্য-বন্ধু বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটল্সের শিল্পী জর্জ হ্যারিসনকে নিয়ে এই অবিস্মরণীয় কনসার্টের আয়োজন করেছিলেন।
সে সময়, ১৯৭১ সাল, মুক্তিযুদ্ধ চলছে। তখন আমরা ছিলাম আগরতলায়, জর্জ হ্যারিসনের দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর কথা অল্পই জানতে পেরেছিলাম। দেশ স্বাধীন হলে যখন দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ-এর কথা আরও বিস্তারিত জানতে পারি, তখন গভীর আবেগে আপ্লুত হয়েছিলাম, অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সেই সঙ্গে কনসার্টটির অ্যালবাম সংগ্রহ করা ও গানগুলো শোনার গভীর ব্যাকুলতাও সৃষ্টি হয়েছিল মনের গভীরে। সে সময় এখনকার মতো এত সহজেই বিদেশি গানের অ্যালবাম পাওয়া বা শোনার সহজসুলভ ব্যবস্থা ছিল না।
১৯৭৭ সালে কূটনীতিক মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ, বর্তমানে সাংসদ, তিনটি লং প্লে রেকর্ডসহ পুরো দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ অ্যালবামটি আমাকে উপহার দেন। তার পর থেকে কতবার যে অবিস্মরণীয় সেই অ্যালবামের গানগুলো শুনেছি! অ্যালবামটির সঙ্গে একটি পুস্তিকাও ছিল। তাতে ছিল ওই কনসার্ট নিয়ে রবিশংকরের সাক্ষাৎকার, বেশ কিছু তথ্য আর দারুণ সব ছবি। গভীর আগ্রহ নিয়ে তা পড়েছি, জেনেছি। সত্যি বলতে কি, অ্যালবামটি শোনা ও পুস্তিকাটি পড়ার পর এ নিয়ে আমাদের আগ্রহ দিনে দিনে আরও বেড়েছে। বিভিন্নভাবে এই কনসার্ট নিয়ে নানা তথ্য সংগ্রহ করেছি। এখনো করে যাচ্ছি। অনেক জায়গায় এ সম্পর্কে বলেছি, লিখেছি। সেই কনসার্ট নিয়ে উদ্দীপ্ত হই, অনুপ্রাণিত হই এখনো। এভাবেই কয়েক বছর আগে সিঙ্গাপুরে বইয়ের দোকান বোডার্সে পেয়ে যাই জর্জ হ্যারিসনের লেখা বই আই-মি-মাইন । এই বইয়ে রয়েছে দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু নতুন তথ্য ও বর্ণনা। আরও পাই তাঁর ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ গানটি লেখার প্রেরণার কথা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই জর্জ হ্যারিসনের প্রতি এক গভীর ভালোবাসা তৈরি হয় আমাদের মধ্যে।
দুই.
জর্জ হ্যারিসনের প্রতি সেই ভালোবাসা থেকে গত ফেব্রুয়ারিতে স্ত্রী অলিভিয়া হ্যারিসন ঢাকায় এলে (১৫ ফেব্রুয়ারি) সোনারগাঁও হোটেলে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছি দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, ‘১৯৬৫ সালে এক রাতে রবিশংকরের সঙ্গে পরিচয় হয় জর্জ হ্যারিসনের। জর্জ বছর তিনেক সেতার নিয়ে অনুশীলন করেছিল রবিশংকরের কাছে। রবির মাধ্যমেই বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে রবির যন্ত্রণার সঙ্গী হয়ে কনসার্টের দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিল জর্জ। সব সময় ওকে বলতে শুনেছি, বাংলাদেশের জন্য তার আরও কিছু করার ছিল।’
অলিভিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, কনসার্টটির কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল জর্জ হ্যারিসনের। বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা আর গণহত্যা তাঁর অন্তরকে গভীরভাবে স্পর্শ করে গিয়েছিল। অলিভিয়া বলেছিলেন, ‘জর্জের কাছে শুনেছি, একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা, ধ্বংস আর হানাহানি বিপর্যস্ত করে তুলেছিল রবিশংকরকে। এ নিয়ে মনঃকষ্টে ছিল সে। অন্যদিকে নিজের রেকর্ডিং নিয়ে ব্যস্ত ছিল জর্জ। সত্তরে বিটল্স ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে ক্যারিয়ার গড়তে সে মনোযোগী হয়ে ওঠে। এ সময় রবিশংকর জানায়, বাংলাদেশের জন্য তহবিল সংগ্রহে একটি কনসার্ট করতে চায়। এ উদ্যোগে সে জর্জকে পাশে পেতে চায়। জর্জেরও মনে হলো, এ কাজে তার নিযুক্ত হওয়া উচিত। তার ডাকে অনেকে সাড়া দেবে, একাত্তরের উত্তাল দিনগুলোর মাঝামাঝি সময়ে ওই কনসার্ট আয়োজন সময়োপযোগী ছিল। জর্জ তখন বব ডিলান, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্রেস্টন, রিঙ্গো স্টার, লিওন রাসেল, ওস্তাদ আলী আকবর, ওস্তাদ আল্লা রাখা ও রবিশংকরকে নিয়ে কনসার্ট আয়োজন করে। ওই কনসার্ট দিয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে জর্জের বন্ধন শুরু।’
অলিভিয়া হ্যারিসন ‘জর্জ হ্যারিসন ফান্ড ফর ইউনিসেফ’-এর প্রতিষ্ঠাতা। গত ফেব্রুয়ারিতে তিন দিনের জন্য ইউনিসেফের সহায়তায় বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানের কাজ দেখতেই এসেছিলেন ঢাকায়। তিনি ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দরিদ্র শিশু ও কিশোরদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু কাজ দেখেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে শিশুদের জন্য কিছু কর্মসূচি চলে জর্জ হ্যারিসন ফান্ডের সহায়তায়। ভবিষ্যতে হাওর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে শিশু-কিশোরদের নৌকাস্কুল কর্মসূচির জন্য সহায়তা নিয়ে অলিভিয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে ইউনিসেফের। এটাই ছিল তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফর। বছরের পর বছর ধরে তিনি তাঁর প্রয়াত স্বামীর শুরু করা মানবিক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছেন, যে কাজের সুফল পাবে বাংলাদেশের শিশুরা।
তিন.
জর্জ হ্যারিসন যখন দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তখন বিটল্সের সহশিল্পীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্বস্তিকর ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি আত্মাভিমান ত্যাগ করে সহশিল্পী ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কনসার্টে অংশ নেওয়ার অনুরোধ জানান। বিটল্সের ড্রামার রিঙ্গো স্টার রাজি হয়েছিলেন এক কথায়। বিল প্রেস্টন, লিওন রাসেলও প্রথমবারেই রাজি হলেন। বব ডিলান ও এরিক ক্ল্যাপটনও প্রস্তাবটি বিবেচনার আশ্বাস দিলেন। কিছুটা অনিশ্চয়তার পর দুজনই অংশ নিয়েছিলেন।
জর্জ হ্যারিসন অনুষ্ঠানে হাজার হাজার শ্রোতাকে ধন্যবাদ জানিয়ে শুরুতেই বলেন, ‘ভারতীয় সংগীত আমাদের চেয়ে অনেক গভীর।’ তারপর পণ্ডিত রবিশংকর ও ওস্তাদ আলী আকবর খান এবং সহশিল্পীদের পরিচয় করিয়ে দেন। কনসার্টটির শুরুতেই পণ্ডিত রবিশংকর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, ‘প্রথম ভাগে ভারতীয় সংগীত থাকবে। এর জন্য কিছু মনোনিবেশ দরকার। পরে আপনারা প্রিয় শিল্পীদের গান শুনবেন। আমাদের বাদন শুধুই সুর নয়, এতে বাণী আছে। আমরা শিল্পী, রাজনীতিক নই। বাংলাদেশে অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশের পল্লিগীতির সুরের ভিত্তিতে আমরা বাজাব “বাংলা ধুন”।’ তিনি ‘বাংলা ধুন’ নামের একটি নতুন সুর সৃষ্টি করেছিলেন। সেটি দিয়েই আলী আকবরের সঙ্গে যুগলবন্দীতে কনসার
Leave a Reply